শ্রীলঙ্কা, ভারত মহাসাগরের মুক্তো, একটি দ্বীপ রাষ্ট্র যা তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, সমৃদ্ধ ইতিহাস এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের জন্য বিখ্যাত। এখানে রয়েছে সোনালী সৈকত, প্রাচীন মন্দির, বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য এবং মনোরম পর্বতমালা। যারা একটি স্মরণীয় ছুটির পরিকল্পনা করছেন, তাদের জন্য শ্রীলঙ্কার ১৬টি অনন্য পর্যটন স্থান নিচে দেওয়া হলো:
![]()
১. সিগিরিয়া রক ফোর্ট্রেস (Sigiriya Rock Fortress)
এটি একটি বিশাল পাথরের ওপর নির্মিত প্রাচীন দুর্গ। রাজা কাশ্যপ এটি তার রাজধানী হিসেবে ব্যবহার করতেন। এর চূড়ায় উঠতে ১২০০-এর বেশি সিঁড়ি বাইতে হয়।
বিশেষ আকর্ষণ: পাথরের গায়ে আঁকা সুন্দর ‘ফ্রেশকো’ চিত্রকর্ম, বিশাল ‘লায়ন গেট’ এবং উপরে অবস্থিত রাজকীয় বাগান।
ভ্রমণের সেরা সময়: জানুয়ারি থেকে এপ্রিল (শুষ্ক আবহাওয়ার জন্য)।

২. ক্যান্ডি (Kandy)
পাহাড় দিয়ে ঘেরা এই শহরটি শ্রীলঙ্কার সাংস্কৃতিক রাজধানী। এটি একটি পবিত্র শহর কারণ এখানে গৌতম বুদ্ধের পবিত্র দাঁত সংরক্ষিত আছে।
বিশেষ আকর্ষণ: ‘টেম্পল অফ দ্য টুথ রেলিক’ (Temple of the Tooth Relic) এবং ক্যান্ডি লেকের পাশে সান্ধ্যকালীন লোকজ নৃত্য।
ভ্রমণের সেরা সময়: ডিসেম্বর থেকে এপ্রিল।

৩. নুয়ারা এলিয়া (Nuwara Eliya)
এটিকে শ্রীলঙ্কার ‘সুইজারল্যান্ড’ বলা হয়। ব্রিটিশ আমলের ভবন এবং ঠান্ডা আবহাওয়ার জন্য এটি মধুচন্দ্রিমা ও পারিবারিক ভ্রমণের সেরা জায়গা।
বিশেষ আকর্ষণ: বিশাল চা বাগান পরিদর্শন, গ্রিগরি লেকে স্পিডবোট রাইড এবং সীতা আম্মান মন্দির।
ভ্রমণের সেরা সময়: মার্চ থেকে জুন।
৪. এলা (Ella)
হাইকিং প্রেমীদের স্বর্গরাজ্য। এখানকার মেঘে ঢাকা পাহাড় আর ঝরনা পর্যটকদের মুগ্ধ করে।
বিশেষ আকর্ষণ: নাইন আর্চ ব্রিজ (Nine Arch Bridge), যেখান দিয়ে ট্রেন চলাচলের দৃশ্যটি আইকনিক। এছাড়া ‘লিটল অ্যাডামস পিক’ থেকে সূর্যোদয় দেখা।
ভ্রমণের সেরা সময়: জানুয়ারি থেকে মার্চ।
৫. ইয়ালা ন্যাশনাল পার্ক (Yala National Park)
বন্যপ্রাণী সাফারির জন্য এটি শ্রীলঙ্কার সেরা জায়গা। চিতাবাঘ বা লেপার্ড দেখার জন্য এটি বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থান।
বিশেষ আকর্ষণ: ওপেন টপ জিপ সাফারি। এখানে চিতাবাঘ ছাড়াও হাতি, কুমির এবং প্রচুর ময়ূর দেখা যায়।
ভ্রমণের সেরা সময়: ফেব্রুয়ারি থেকে জুন (যখন পানি কম থাকে এবং প্রাণীরা বাইরে আসে)।
৬. গ্যাল্লে ফোর্ট (Galle Fort)
সমুদ্রের তীরে অবস্থিত এই দুর্গ শহরটি ১৬শ শতাব্দীতে পর্তুগিজরা তৈরি করে। এখানকার ছোট ছোট গলিগুলোতে ইউরোপীয় আমেজ পাওয়া যায়।
বিশেষ আকর্ষণ: গ্যাল্লে লাইটহাউস, প্রাচীন ডাচ চার্চ এবং সূর্যাস্তের সময় দুর্গের দেওয়ালে হাঁটা।
ভ্রমণের সেরা সময়: ডিসেম্বর থেকে মার্চ।


৭. অনুরাধাপুরা (Anuradhapura)
এটি শ্রীলঙ্কার সবচেয়ে প্রাচীন এবং বড় রাজকীয় রাজধানী ছিল। এখানকার বিশাল সাদা স্তূপগুলো কয়েক হাজার বছরের পুরনো।
বিশেষ আকর্ষণ: ২,০০০ বছরের পুরনো ‘জয়া শ্রী মহা বোধি’ গাছ, যা ভারতের বুদ্ধগয়া থেকে আসা শাখা থেকে রোপিত।
ভ্রমণের সেরা সময়: মে থেকে সেপ্টেম্বর।


৮. পোলোনারুয়া (Polonnaruwa)
শ্রীলঙ্কার দ্বিতীয় প্রাচীন রাজধানী। এখানকার স্থাপত্য এবং পাথরের ভাস্কর্যগুলো অত্যন্ত নিখুঁত।
বিশেষ আকর্ষণ: ‘গাল বিহার’ (Gal Vihara) যেখানে পাথরে খোদাই করা বুদ্ধের চারটি বিশাল মূর্তি রয়েছে।
ভ্রমণের সেরা সময়: মে থেকে আগস্ট।


৯. ডাম্বুলা গুহা মন্দির (Dambulla Cave Temple)
পাথরের পাহাড়ের ভেতর ৫টি গুহা নিয়ে এই মন্দির গঠিত। এখানে বুদ্ধের দেড় শতাধিক মূর্তি ও সুন্দর ছবি রয়েছে।
বিশেষ আকর্ষণ: গুহার ছাদ জুড়ে করা প্রাচীন রঙিন চিত্রকর্ম যা আজও অম্লান।
ভ্রমণের সেরা সময়: বছরের যেকোনো সময় (জানুয়ারি-এপ্রিল ভালো)।


১০. মিরিসা (Mirissa)
বিশ্রামের জন্য আদর্শ সমুদ্র সৈকত। এখান থেকে গভীর সমুদ্রে নীল তিমির সন্ধানে যাওয়া হয়।
বিশেষ আকর্ষণ: তিমি দেখা (Whale Watching) এবং ‘কোকোনাট ট্রি হিল’ এ ছবি তোলা।
ভ্রমণের সেরা সময়: নভেম্বর থেকে এপ্রিল।


১১. ট্রিনকোমালি (Trincomalee)
শ্রীলঙ্কার উত্তর-পূর্ব তীরের এই স্থানটি সাদা বালির সৈকত এবং হিন্দু মন্দিরের জন্য বিখ্যাত।
বিশেষ আকর্ষণ: পাহাড়ের ওপর অবস্থিত ‘কোনেশ্বরন মন্দির’ এবং কবুতর দ্বীপ (Pigeon Island) এ স্নরকেলিং।
ভ্রমণের সেরা সময়: মে থেকে সেপ্টেম্বর।


১২. অ্যাডামস পিক (Adam’s Peak / Sri Pada)
একটি পবিত্র পর্বত চূড়া, যার ওপর একটি পদচিহ্ন রয়েছে। বৌদ্ধ, হিন্দু এবং মুসলিমরা এটি ভিন্ন ভিন্ন কারণে পবিত্র মনে করেন।
বিশেষ আকর্ষণ: মাঝরাতে পদযাত্রা শুরু করে পাহাড়ের চূড়া থেকে সূর্যোদয় দেখা।
ভ্রমণের সেরা সময়: ডিসেম্বর থেকে মে (অন্য সময় মেঘ ও বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকে)।


১৩. উদাওয়ালয় ন্যাশনাল পার্ক (Uda Walawe)
আপনি যদি সাফারিতে হাতি দেখতে চান, তবে এটিই সেরা জায়গা। এখানকার পরিবেশ অনেকটা আফ্রিকার সাভানা অঞ্চলের মতো।
বিশেষ আকর্ষণ: এলিফ্যান্ট ট্রানজিট হোম, যেখানে অনাথ হাতি ছানাদের দুধ খাওয়ানো হয়।
ভ্রমণের সেরা সময়: মে থেকে অক্টোবর।


১৪. হিক্কাদুয়া (Hikkaduwa)
এটি শ্রীলঙ্কার কচ্ছপ এবং প্রবাল প্রাচীর (Coral Reef) এর জন্য বিখ্যাত।
বিশেষ আকর্ষণ: সৈকতেই বড় বড় কচ্ছপ দেখা যায়। গ্লাস-বটম বোটে করে সমুদ্রের নিচের রঙিন জগত দেখা।
ভ্রমণের সেরা সময়: নভেম্বর থেকে এপ্রিল।



১৫. রত্নাপুরা (Ratnapura)
রত্নাপুরা মানে ‘রত্নের শহর’। এখান থেকেই বিশ্বের বিখ্যাত কিছু নীলকান্তমণি এবং অন্যান্য রত্ন উত্তোলিত হয়।
বিশেষ আকর্ষণ: রত্ন খনি পরিদর্শন এবং স্থানীয় জেম মিউজিয়াম।
ভ্রমণের সেরা সময়: জানুয়ারি থেকে মার্চ।


১৬. জাফনা (Jaffna)
শ্রীলঙ্কার উত্তরের এই শহরটি তামিল সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র। এখানকার খাবার এবং মন্দিরগুলো দক্ষিণ শ্রীলঙ্কার চেয়ে একদম আলাদা।
বিশেষ আকর্ষণ: ‘নাল্লুর কান্দাস্বামী মন্দির’ এবং নৌকায় চড়ে ‘ডেলফ্ট আইল্যান্ড’ ভ্রমণ যেখানে বুনো ঘোড়া দেখা যায়।
ভ্রমণের সেরা সময়: জানুয়ারি থেকে আগস্ট।








